
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং বিতর্কিত 'ভোটার তালিকা সংশোধন' (এস আই আর)-এর মাধ্যমে নজিরবিহীন ভোট চুরির অভিযোগে সোমবার সকালে থমথমে হয়ে ওঠে ভারতের রাজধানী দিল্লি। প্রধান বিরোধী জোট ইন্ডিয়া-এর আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে এলে সেন্ট্রাল দিল্লির পুরো এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘চলো দিল্লি - গণতন্ত্রের জন্য পদযাত্রা’ শীর্ষক এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিরোধীরা সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে যাত্রা শুরু করলে কানট প্লেস ও মান্ডি হাউসের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা অভূতপূর্ব মাত্রায় জোরদার করা হয়। শেষ পর্যন্ত বিরোধী নেতাদের সুপ্রিম কোর্ট পৌঁছানোর আগেই ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয় পুলিশ। তবে রাজপথ যখন উত্তাল, ঠিক তখনই বিরোধীদের আইনি দল সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পিটিশন দাখিল করে।
কনট প্লেস ও বারখাম্বা রোড ক্রসিং থেকে শুরু হওয়া এই পদযাত্রার নেতৃত্বে ছিলেন কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী, তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং 'আইসা' প্রধান নেহা বোরা। পরবর্তীতে তাঁদের সাথে যোগ দেন সমাজবাদী পার্টির (এসপি) সভাপতি অখিলেশ যাদব এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) শীর্ষ নেতা তেজস্বী যাদব।সরকারি আদেশ
পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে গতিপথ রুদ্ধ করলে রাহুল গান্ধীসহ শীর্ষ নেতারা একটি খোলা ট্রাকের ওপর চেপে বসেন। সেখান থেকেই হাজার হাজার সমর্থকের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন রাহুল গান্ধী।
সংবাদ সম্মেলনে ও ট্রাকে দাঁড়িয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, "আমাদের লড়াই শুধু কোনো একটি নির্বাচনের জন্য নয়; এটি সংবিধান রক্ষা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আমূল সংস্কার করার লড়াই। যতক্ষণ না নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বের পরিবর্তন হচ্ছে এবং সংবিধানের মর্যাদা পুনরুদ্ধার হচ্ছে, এই সংগ্রাম থামবে না।"
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি নিশানা করে রাহুল বলেন, "আপনি পদত্যাগ করুন এবং সরকারি সাক্ষী হয়ে যান। আপনি একটি বিরাট ভুল করেছেন, তবে আমরা জানি এই চক্রান্তের আসল মস্তিষ্ক আপনি নন। আমরা এটাও জানি যে জ্ঞানেশ কুমার রাতে ঘুমাতে পারছেন না। আমি তাঁকে সরাসরি বলছি, আপনি সিইসি পদে বেশিদিন টিকে থাকতে পারবেন না।"
আন্দোলনকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানিয়ে রাহুল বলেন, "এটি ভারতের গণতন্ত্র বাঁচানোর যুদ্ধ। আপনারা যে দলেরই সমর্থক হন না কেন, এমনকি বিজেপির সাধারণ সমর্থকরাও যদি মনে করেন যে সংবিধানের ওপর আক্রমণ হচ্ছে, তবে আপনারাও এই পদযাত্রায় যোগ দিন। নরেন্দ্র মোদী তো দূর, ভারত কাউকে ভয় পায় না।"
আন্দোলন দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, "এটি কোনো সাধারণ বিক্ষোভ নয়, এটি শিবের তাণ্ডব নাচের মতো! এই ‘শিবের বরযাত্রীতে’ যে কেউ যোগ দিতে পারেন। এই লড়াই দিন, মাস কিংবা বছর ধরে চললেও আমরা থামব না।"
সোশ্যাল মিডিয়া এবং রাজপথে তরুণের জোয়ার ফিরিয়ে আনা আইসা প্রধান নেহা বোরাকে নিয়ে দিল্লির প্রশাসনিক মহলে ছিল বাড়তি উদ্বেগ। সাম্প্রতিক জেন-জি আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ নেহা বোরা বহুবার পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। সোমবারেও তিনি রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার পাশাপাশি থেকেই পুরো পদযাত্রাকে পরিচালনা করেন।
উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদব দিল্লি বিমানবন্দরে পা রাখার পরপরই তাকে জন্তর মন্তর প্রাঙ্গণের আন্দোলন নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে অখিলেশ একচোট হেসে বলেন, "সরকার স্থান বাতিল করতে পারে, কিন্তু জনগণ যেখানেই দাঁড়াবে, সেটাই হয়ে উঠবে জন্তর মন্তর!" আগামী বছর উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির এই অভূতপূর্ব ঐক্য ক্ষমতাসীন বিজেপি শিবিরের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্দোলন ঘিরে দিল্লি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কেন্দ্রীয় দিল্লির অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন কয়েক ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে সাধারণ যাত্রীরা মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েন। যদিও দুপুরের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে স্টেশনগুলো পুনরায় খুলে দেওয়া হয়।
ঐতিহাসিক প্রতিবাদ কেন্দ্র 'জন্তর মন্তর'-এর সরকারি স্বীকৃতি সম্প্রতি দিল্লি পুলিশ প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকে বিরোধীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে। সুপ্রিম কোর্টের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর বেশ কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের প্রথম সারির শক্ত ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন এবং সুপ্রিম কোর্টের তোরণের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালান।
বিরোধী দলগুলোর এই অভূতপূর্ব আন্দোলনের মূল সূত্রপাত 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন থেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের নির্বাচন কমিশনের অপর দুই কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী—গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশন প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও আদেশের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন।
বেশিরভাগ আপত্তিই ছিল বিতর্কিত 'বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা' (এসআইআর) সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর, যা নিয়ে বিরোধীরা শুরু থেকেই নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগ তুলে আসছে। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ এই তীব্র মতভেদে স্পষ্ট যে কমিশনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার একতরফাভাবে সরকারের সুবিধা নিশ্চিত করছেন।
যদিও নির্বাচন কমিশন এক বিবৃতিতে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে, যেকোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ে মতভিন্নতা থাকা একটি স্বাভাবিক এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
ভারতের প্রধান বিচারপতির (সিজেআই) কাছে বিরোধী দলগুলো সরাসরি সাক্ষাতের সময় চেয়ে চিঠি লিখলেও, প্রধান বিচারপতি তা খারিজ করেন এবং জানান, বিষয়টি আদালত চত্বরের আইন-শৃঙ্খলার আওতাধীন নয়। তিনি বিরোধী দের সরাসরি আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন দাখিল করার পরামর্শ দেন। প্রধান বিচারপতির সেই পরামর্শ মেনেই আজ বিরোধী শিবিরের আইনি দল আদালতের রেজিস্ট্রি শাখায় রিট পিটিশন জমা দেয়।
অন্যদিকে, শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষ থেকে এই পুরো পদযাত্রাকে চরম নাটকীয়তা বলে অভিহিত করা হয়েছে। দলের মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া এক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, "রাহুল গান্ধী ও তাঁর সহযোগীরা সস্তা 'রাজনৈতিক নাটক' করছেন। দেশের গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমাগত কালিমালিপ্ত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।"
রাজপথে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। প্রতিবাদের কারণ হিসেবে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) এক গবেষণা শিক্ষার্থী অনিরুদ্ধ সিয়াগ সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, "দেশের মৌলিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর ক্রমাগত হামলা চালানো হচ্ছে। আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলছে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া আমার দায়িত্ব।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলো দিল্লি কর্মসূচির মাধ্যমে বিরোধী দল 'ইন্ডিয়া' জোট কেবল রাজপথই দখল করেনি, বরং ২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক মৌসুমে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভকে এক নতুন রাজনৈতিক মোড় এনে দিয়েছে। রাহুল গান্ধীর এই "দীর্ঘ লড়াইয়ের" হুঙ্কার দিল্লির মসনদে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।